পরাজিত সৈনিক
** পরাজিত সৈনিক **
আমার আলো আজ ফুলের সাজে চলেছে তাঁর শেষ যাত্রায়। আজকে আমার আলো কিন্তু একবারও কপট রাগ দেখিয়ে আমাকে বলল না তো "এই 'শুভ ! আমাকে কেমন লাগছে তাড়াতাড়ি বলো" ।
" নইলে কিন্তু আমি আমার সব সাজ খুলে ফেলবো। তুমি ভালো না বলা অবধি আমার সেজে শান্তি হয় না জানোই তো তুমি"। এই সোহাগের অভিযোগ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিত্যদিনের ছিল আলোর।
আমারও খুব ভালো লাগতো কিভাবে আলো নিজেকে একটু একটু করে অপরূপা করে তুলতো। তখন বউ ভাগ্য নিয়ে মনে মনে ভীষণ গর্ব হতো আমার। আলো শুধু অসামান্য সুন্দরী নয় তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসারও একমাত্র অধিকারী আমি ছিলাম, এটাই ছিল আমার জীবনের পরমপ্রাপ্তি।
আমি চোখ ভর্তি জল নিয়ে নির্বাক হয়ে গেছি আলোকে এইরকম সাজা অবস্থায় দেখে। আমি তো পুরুষ মানুষ আমি চিৎকার করে কাঁদতে পারছি না, হয়তো পৌরুষত্বের গড়িমায় নয়তো ঈশ্বরের অদ্ভুত সৃষ্টির জন্য । পুরুষদের বুক ফেটে চৌচির হয়ে যায়, মনের ভিতর হাহাকার করে প্রিয়জনের বিরহ ব্যাথায় তবু গলা দিয়ে আওয়াজ কেন বেরোয় না। হে ভগবান আমি আর সহ্য করতে পারছি না।
প্লিজ 'আলো' ! তুমি আমার সঙ্গে ঝগড়া করো , অভিমান করো কিন্তু এইরকম চুপ করে থেকো না। তুমি কি দেখতে পাচ্ছো না তোমার শুভর কি ভীষণ কষ্ট হচ্ছে, আমি যে নির্বাক হয়ে তোমার দিকে তাকিয়ে আছি আলো । যাবার আগে তো তুমি একদম সুস্থ ছিলে আমাকে সব কাগজ পত্র গুছিয়ে নেবার জন্য ব্যাগ দিলে, কত সাবধান করলে তারপর এইরকম অঘটন কেমন করে হলো আমি মানতে পারছি না।
কতজন কত কথা বলছে ,'আলো'! আমার মাথায় কিছু ঢুকছে না। আমি এখনও মানতে পারছি না তোমার এই অন্তিম সাজ।
এই কাপড়টাই তো এই বছর বিবাহবার্ষিকীর দিন পরবে বলে আমার সঙ্গে গিয়ে কিনে এনেছিলে। আমাকে বলেছিলে এবার বিবাহবার্ষিকীর দিন তোমার পছন্দের শাড়ি পরবো। আমি যখন তোমাকে বলেছিলাম "আমি কি শাড়ির কিছু বুঝি?", তুমি নাছোড়বান্দা বলেছিলে "এত বছর একসাথে আছি আমি জানি তোমার পছন্দ , কোন রঙটা আমাকে মানাবে তোমার থেকে ভালো আর কে বুঝবে বলতো"। অগত্যা আমাকেই পছন্দ করতে হয়েছিল কিন্তু আমাদের বিবাহবার্ষিকী তো আরো দুদিন পর তাহলে আজ ও কেন পরেছো ওই শাড়িটা ।
সেদিন কাউন্টারে শাড়ির দাম দেবার সময় আমাকে চুপিচুপি বলেছিলে "শুধু শাড়ি উপহার দেওয়া বত্রিশবছরের বিবাহবার্ষিকীতে এত ফাঁকি চলবে না, গহনা উপাহারও এবার দিতে হবে তোমাকে"।আমি হেসে ফেলছিলাম তোমার কথা শুনে, মাথা নেড়ে বলেছিলাম "আলো তুমি মুখ ফুটে বলেছো যখন তখন অবশ্যই আমি কিনে দেবো, এখন বলো কি চাই তোমার?", তুমি লজ্জা পেয়ে বলেছিলে "এমা তুমি সেই একইরকম আছো ইয়ার্কিও বোঝনা। এই বুড়ো বয়েসে গহনা দিয়ে কি হবে বলতো আমার,আর সাজার বয়েস আছে নাকি এখন। আমি বলেছিলাম "কে বলল তোমার সাজার বয়েস নেই। তুমি সাজলে যে আমি এখনও মুগ্ধ হয়ে দেখতে থাকি"।
আলো সেইজন্যই তোমাকে না জানিয়ে ব্যাংকের কাজ আছে বলে বেড়িয়েছিলাম। আসলে সব জমা সুদ একটা একাউন্টে করতে ব্যাংকে গেছিলাম। ভেবেছিলাম ব্যাংকের থেকে ফিরে তোমাকে নিয়ে বৌবাজার থেকে একটা কিছু কিনে দেবো। আজকের যা কিছু জমানো সবতো তোমার কেরামতি। আমি শুধু মাসের প্রথমে তোমাকে টাকাটা এনে ধরে দিতাম। তুমি দুই ছেলে মেয়ের পড়াশোনার খরচ সামলে, সংসারের সব খরচা সামলিয়ে জমিয়ে রেখেছিলে ভবিষ্যতের জন্য। এই টাকাতে শুধু তোমার একমাত্র অধিকার আমি মনে করি।
ব্যাঙ্কের কাজ সারতে সারতে বেশ কিছুটা সময় লেগে গেছে হঠাৎ দেখি বড় খোকা ,ওর দুই বন্ধু। ওদের দেখে আমি বললাম "কিরে তোরা কেন ?",বড় খোকা বলল "কখন এসেছো তুমি খেয়াল আছে তোমার"। বেড়িয়ে দেখি গাড়ি , আমার কেমন একটা ভয় হতে লাগলো কারুর কিছু হয়নি তো। আমাদের বাড়ি থেকে হেঁটেই যাওয়া যায় ব্যাংক।
ওর মায়ের সামনে আমাকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে বড় খোকা বলল বাবা ভট্টাচার্য কাকুরা এসেছেন তোমার সঙ্গে দেখা করতে। আমি হাতের ইশারায় বসতে বললাম কথা বলার মত ক্ষমতা নেই। কেউ একগ্লাস সরবৎ নিয়ে এসেছিল তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে কাঠ তবু মুখে ঠেকাতে পারলাম না।
ইতিমধ্যে আলোর দিদি হাজির হয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলো বোন তুই যে আমাকে তোদের বিবাহবার্ষিকীতে নিমন্ত্রণ করলি। তুইতো শুভজিৎ কে ছেড়ে একদিনও কোথাও থাকতিস না। শুভজিৎ কে কার ভরসায় রেখে হঠাৎ করে চলে গেলি বোন।
আমি যেন ফিরে গেলাম সেই আমার ছোড়দার বাসর ঘরে যেখানে আমি প্রথম আলোকে দেখেছিলাম। সেই প্রথম দেখাতেই আমি আলোর প্রেমে পরে যাই । ছোড়দার আর বৌদির বহুদিনের প্রেমের পর বিয়ে। ওদের ভালো কথাবার্তা চলছিল বাসর ঘরে সবার সামনেই।
আমি আলোর সঙ্গে কথা বলার অছিলায় বললাম "আমাকে একটু টয়লেটটা দেখিয়ে দেবেন"। আলো নিঃসঙ্কোচে আমাকে বলল "আসুন আমার সঙ্গে"। ছোটবৌদিদের গ্রামে বাড়ি তাই টয়লেটটা বাড়ির বাইরে বাগানে, আমার একটু ভয় ভয় করছিলো যদি প্রচুর আলো ছিল । আলো আমার দিকে হাত বাড়িয়ে বলল "আমার হাত ধরে আসুন আপনাদের তো এরকম জায়গায় চলাফেরা করার অভ্যাস নেই"। আমি বললাম "আপনার বুঝি আছে অভ্যাস ",আলো হেসে মাথা নেড়ে বলল "না এটা আমার মাসির বাড়ি"।
সেই প্রথম কোন মেয়ের হাত ধরা , ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়ি দু , একটা মেয়ের সঙ্গে আলাপ হয়েছে তবে সেরকম ভাবে নয়। কিন্তু আলোর হাত ধরতেই আমার মনের মধ্যে অদ্ভুত ভাললাগা, আমি মনে মনে ভগবানকে বললাম "এই হাত যেন সারাজীবন ধরে চলতে পারি কোনদিন যেন এই হাত ছাড়তে না হয়"। এরপর আলোর সঙ্গে আমার কেমন করে যেন খুব ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গেল।
ছোটবৌদির কাছে মাঝে মাঝে আলো আসতো আর আমি ওকে নিয়ে কলকাতায় শহর দেখাবার নাম করে ঘুরে বেড়াতাম। আস্তে আস্তে দুজনে দুজনকে নাম ধরে অবশেষে তুমিতে নেমে এসেছিলাম কিছুদিনের মধ্যেই । আলো বলতো "শুভ তোমাকে ভালো রেজাল্ট করতে হবে, আমার জন্য তোমার পড়ার ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে না তো"। আমি হেসে বলতাম "তুমি এলে আমি আলাদা এনার্জি পাই পড়ার বোঝনা। কলেজের টপার হবার সবসময় চেষ্টা করি তাহলে কলেজ ক্যাম্পাসে কেউ আমার চাকরি আটকাতে পারবে না। একবার চাকরিটা পাই তারপর তোমাকে তুলে নিয়ে পারমেন্টলি চলে আসবো"।
আমি কথা রেখেছিলাম চাকরি পাওয়ার ছমাসের মধ্যে ছোটবৌদির মধ্যস্থতায় দুবাড়ির সম্মতিতে আলোকে আমার সহধর্মিণী করে ছিলাম। আলো আমার শুধু বউ ছিলনা ও আমার জীবনের সব ছিল। এত ভালবাসা,এত সহমর্মিতা ওর মধ্যে ছিল যারজন্য আমি ভীষণ সুখী হয়েছিলাম বিবাহিত জীবনে।
আলো কিছুদিন একটা স্কুলে চাকরি করতো । এক ঘন্টার ট্রেন জার্নি করে ছেলে, মেয়েদের মানুষ করা ওর পক্ষে সত্যি কষ্টকর হচ্ছিল । তবু আমি ওর স্বাধীনতায় বাধা দিইনি, লেখাপড়া জানা মেয়ে কেন বাড়িতে বসে থাকবে। তবে আমি যখন একটা বড় কোম্পানিতে চাকরি পেয়ে মুম্বাই গেলাম তখন নিজেই চাকরি ছেড়ে আমার সঙ্গে চলে গেছিল।
মুম্বাইতে আমরা প্রায় কুড়ি বছর ছিলাম। বড় খোকা কলকাতায় চাকরি পেলে আমরা আবার কলকাতায় ফিরে আসি। আমাকে কখনও কিছু ভাবতে হয়নি সব আলো সামলেছে একা হাতে। অদ্ভুত ওর বিচক্ষণ ক্ষমতা ছিল, তেমন ছিল সহনশীলতা। সমস্ত রকমের সাংসারিক ঝামেলা ঠান্ডা মাথায় সামলাত আমাকে বুঝতেই দিতোনা।
সেই আলো আজ সব ফেলে ফুলপরী সেজে আমাকে ছেড়ে চির বিদায়ের পথে। বড় ছেলের কাছে জানতে পারলাম 'আলো' আমি বেরিয়ে যাবার একটু পরেই কাজের মেয়েটাকে দিয়ে ডেকে পাঠিয়েছি ওকে। বড় খোকা এসে দেখে মা দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছে। বড় খোকা ঘাবড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করে মা তোমার কি হয়েছে তখন বড় খোকার হাতের পরে এলিয়ে পরে। ওরা জল দিয়ে হাওয়া বাতাস করতে তাকিয়ে বলে বাবাকে দেখিস। বড় খোকা ডাক্তারকে ফোন করে সঙ্গে সঙ্গে বাড়িতে আসতে বলে। কিন্তু ডাক্তার এসে দেখে সব শেষ।ম্যাসিভ হ্রাট এট্যাক -- কোন চিকিৎসার সুযোগ দেয়নি আলো।
সবাই আমাকে বলল "ওকে সিন্দুর পরিয়ে দিতে এটাই নাকি নিয়ম"। মনে ভাবছি যে সিন্দুর পরিয়েছিলাম একদিন আলো তোমাকে আমার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে। আজকে সেই তোমাকে সিন্দুর পরাতে হবে আমাকে পরাজিত সৈনিকের মতো নিয়মে কাঠগড়ায় বন্দী হয়ে।যখন তুমি সব অনুভূতি শূন্য হয়ে আমার ধরা ছোঁয়ার বাইরে অপার্থিব জগতে, যেখানে আমি হাজার চেষ্টা করলেও প্রবেশ করতে পারবো না । আমার আলোকে ছাড়া ভীষণ এক অন্ধকার আমাকে ঘিরে ধরছে। আমার মধ্যে আমি নেই আমি যেন পরাজিত সৈনিক যে হেরে গেছে বিধাতার নিষ্ঠুর বিধানের কাছে।
আমি মন থেকে মেনে নিতে না পারলেও নিয়মে যাঁতাকলে নাস্তানাবুদ, আমার কিছুতেই মন মানছে না ওর এই শেষ পরিণতি দেখার । যে আলোর এতটুকু কষ্ট হলে বা আঘাত লাগলে আমি অস্থির হয়ে যেতাম তাঁর শ্মশান যাত্রী হওয়া আমার কাছে যে চরম শাস্তির।
আলো তো একটু বুঝতে দিলনা ওর চলে যাবার সময় হয়ে গেছে। যখনই জ্বর হয়েছে আমি সারারাত ঘুমাতাম না খানিকক্ষণ অন্তর ওর কপালে হাত দিয়ে দেখতাম। আলো ঠাট্টা করে বলতো ভয় নেই তোমাকে ছেড়ে আমি কোথাও যাবো না। তুমি একটু ঘুমাও আমি তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি। আমি হাত ধরে বলতাম তোমার শরীর খারাপ নিয়ে আর আমার কথা চিন্তা করতে হবে না। একরাত না ঘুমালে কি এমন হবে বলতো। আমি তো সুস্থ সবল মানুষ।
তবে ইদানিং আমার সামান্যতম শরীর খারাপ হলে মাথা খারাপ হয়ে যেত ওর। জোর করে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া, আমার যন্তের শেষ থাকতো না। বলতো 'শুভ' ! "ছেলে, মেয়েরা আমার রক্তের কিন্তু তুমি আমার জীবনের বেঁচে থাকার অবলম্বন। তোমাকে ছাড়া আমার অস্তিত্ব আমি কল্পনায় করতে পারিনা। তোমার বুকে মাথা রেখে সারাজীবন আমি বাঁচতে চাই।
সেই আলো তার নিজের সাজানো বাড়ি ছেড়ে,আমাদের সবাইকে চিরদিনের জন্য ছেড়ে আজকে চলেছে শববাহী গাড়িতে আমি তার পিছনে পিছনে। এখন বিকেল পাঁচটা আর কিছুক্ষণ পর আলোর অস্তিত্ব থাকবে না, কতগুলো ছবি আর স্মৃতির মধ্যে আলোর অস্তিত্ব টিকে থাকবে।
শোকাহত আমি শ্মশানে ঢোকার মুখে বড় খোকাকে ডেকে বললাম আমি আর যাবোনা। আমি এখানেই থাকি তুমি সাবধানে শেষ কাজ করো। আমার বন্ধুরা বলল কেন রে স্বামীর হাতে মুখাগ্নি পরম ভাগ্যবতীর হয় তুই তা থেকে বৌঠানকে কেন বঞ্চিত করবি।
আমি চিৎকার করে বলে উঠলাম রাখ তোদের ওইসব কথা,তোরা একবারও ভাবছিস না আলো আমার ভালবাসা, আমার প্রাণ , আমি পাপ,পূণ্য জানি না। আমি পারবো না আমার আলোকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শেষ করতে। এই নিষ্ঠুর কাজ আমি করতে পারবোনা বলে কেঁদে উঠলাম। আমার জামাইয়ের বাবা আমার পাশে বসে বড় খোকাকে বললেন যাও তুমি মায়ের শেষ কাজ করো গিয়ে আমি ওনার কাছে আছি।
ঘন্টা দুয়েক পর ফিরে এসে বাড়িতে আমি একটাও কথা না বলে কোনরকমে স্নান সেরে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। আমার দু'চোখ জলে ভেসে যাচ্ছে আলোর বালিস আঁকড়ে। গতকাল রাত্রেও কি জানতাম এই আমার শেষ রাত আলোর সঙ্গে। কত স্মৃতি, কত কথা মনের মধ্যে উথাল পাতাল হতে লাগল। আলো নেই ভাবতেই পারছিনা। এত কষ্ট, এত বেদনা কেন আমার প্রাপ্তি হলো জানি না। বিধাতার নিষ্ঠুর পরিহাসে আরো কতদিন আমাকে বাঁচতে হবে জানি না আলোর স্মৃতি নিয়ে।
অবশেষে সকাল হলো ঘরের দরজা খুলতে মনে হলো এক ঝলক বাতাস এসে আমাকে বলে গেলো "হেরে গেছো তুমি, হেরে গেছো-- পারোনি ধরে রাখতে তাকে যাকে ঘিরে তোমার বেঁচে থাকার অস্তিত্ব ছিল। তুমি পারোনি ধরে রাখতে, তুমি হেরে গেছো"।
** অলোকা চক্রবর্তী **
Comments
Post a Comment