একটি মেয়ের গল্প

** একটি মেয়ের গল্প **
**অলোকা চক্রবর্তী ** 

আজকাল একটা অদ্ভুত কথা শুনি মেয়েরা নাকি তাদের স্বভাবজাত নারী সুলভ সহবত হারিয়েছে ।মেয়েদের মধ্যে নাকি সহনশীলতা একদম চলে গেছে।যদিও একথাটা সমাজের নারী,পুরুষের সম্মিলিত আওয়াজ  । কেন সমাজের এই বৈষম্য যত নিয়মের দোহাই মেয়েদের জন্য । মেয়েদের কি স্বাধীনতা নেই মুক্ত আকাশে বিচরণ করার । মেয়েদের না হলে তো সৃষ্টি পথ অবরুদ্ধ হতো ।একমাত্র মেয়েরা তাঁর শরীরে তিল তিল করে গড়ে তোলে সমাজের আগামী প্রজন্মেকে। আগামী প্রজন্ম যদি  ছেলে হয়ে জন্মায় তাহলে সমাজের অনুশাসন তখন অন্ধ । এই অবক্ষয়ের সমাজের মুখোশ খুলে ফেলেছে আজকের অনেক মেয়ে তাই তো এতো গেল গেল রব।একচেটিয়া আধিপত্য থাকছে না প্রবল প্রতিবাদের মুখে পরতে হচ্ছে তাদের ।
               আমি নন্দা ভালবাসতাম গ্রামের গরিব ঘরের ছেলে সুজয়কে। আমাদের গ্রামের পরিবেশ অন্যরকম ছিল তখন স্কুলে আসা,যাওয়ার পথে সুজয়ের সঙ্গে আমার দেখা হতো ,আমাদের সময়ে ছোট্ট গ্রাম ,লোক সংখ্যা কম তাই আমাদের লুকিয়ে দেখা করতে হতো ।সুজয় কলেজে পড়ত,ও খুব পড়াশোনায় ভালো ছেলে, নিজের পড়াশোনার খরচ ও নিজেই টিউশনি করে চালাত ।ওর বাবা সামান্য প্রাথমিক  স্কুলের মাষ্টরমশাই ছিলেন ।তখনকার দিনে স্কুল মাষ্টরমশাইদের খুব সামান্য বেতন ছিল ,তাই দিয়ে সংসার চালাতে হিমসিম খেত সুজয়ের বাবা ,সুজয় সেটা বুঝত তাই পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করত। সুজয়ের বোন আমার বন্ধু তাই ওদের বাড়িতে আবার অবাধ যাতায়াত ছিল ।

সুজয়ের ভাইয়ের পৈতেতে খুব সামান্যই আয়োজন ছিল কিন্তু আমার দুদিনের নিমন্ত্রণ ছিল।বাড়ি থেকে অনুমতি পেয়ে ছিলাম ওদের বাড়িতে থাকার।সুজয়ের বোনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে আমার কাজ করা দেখে সুজয়ের মা বলেছিল নন্দা সুজয় একটা চাকরি পেলে আমি তোমাকে তোমার মা,বাবার কাছ থেকে চেয়ে নেবো আমার ঘরের লক্ষী করার জন্য ।সুজয় দাঁড়িয়ে শুনে হাসছিল আমার দিকে তাকিয়ে । আমাকে ওদের বাড়ির সবাই খুব ভালবাসত।পৈতের দিন  রাতে সারারাত আমি আর সুজয়  সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে সারারাত গল্প করেছিলাম ।সুজয় বলেছিল নন্দা তোমাকে ছাড়া আমি কিছু ভাবতে পারি না ।আমার প্রত্যেকটা ভাবনার সাথে তুমি জড়িয়ে আছো। আমিও তো ভাবতেই পারতাম না সুজয় ছাড়া অন্য কাউকে আমার জীবনে মানতে।

কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস আমার দিদি আমাকে তার বাড়িতে নিয়ে গিয়ে পাত্রপক্ষের সামনে বসায়।পাত্রপক্ষের আমাকে ভীষণ পছন্দ হয় ।কারণ আমি সুন্দরী না হলে সুন্দর আর অষ্টাদশীর লাবণ্য ছটা আমার রুপের জৌলসে যে কেউ মুগ্ধ হবে ।ছেলে ব্যাংকে চাকরি করে, নিজেদের বাড়ি আছে,একটি ছেলে, আর দিদির বিয়ে হয়ে গেছে ।এমন পাত্র পেয়ে আমার মা, বাবা ভুলে গেল সবে বারো ক্লাস পাশ করে আমি কলেজে পড়ি ।কতটুকু মেয়ে, সংসারের কি বুঝি আমি।
আমি প্রচন্ড অশান্তি, কান্নাকাটি করলাম বিয়ে করবো না বলে । কিন্তু আমাকে সবাই বোঝাচ্ছে তুই  কিছু ভাবিস না এতো ভালো ছেলে আর পাওয়া যাবে না । আমি তো দিদির মুখের উপর বললাম আমার থেকে আট,নয় বছরের বড় ছেলেকে আমি কিছুতেই বিয়ে করবো না । দাদা বলল জেদ করে লাভ নেই নন্দা কথা দেওয়া হয়ে গেছে তখন তোকে বিয়ে করতে হবেই । 
আমি সুজয়দের বাড়িতে গিয়ে সব বললাম । সুজয় বলল নন্দা তুমি যে করে হোক বিয়ে আটকাও । আমাকে কিছুদিন সময় দাও আমি একটা চাকরি ব্যবস্থা করেই তোমাকে আমার করে নেবো তখন ক্ষমতা হবে না কারুর  তোমাকে আমার থেকে আলাদা করতে। সুজয়ের মা বললেন নন্দা আজকে সুজয় চাকরি করলে আমি তোমাদের বাড়িতে যেতাম কিন্তু বেকার ছেলের মা আমি কি করে যাই বলো,কোন মুখে বলবো কিছু তাঁরাই বা মেনে নেবে কেন আমার কথা ।

কি জানি আমার কি অভিমান হলো সুজয়ের উপর কোন যোগাযোগ না করে বিয়ের পিঁড়িতে বসেছিলাম । এলাম নতুন জায়গায় বুকের ভিতরে কান্না জমে আছে থাকে দমিয়ে অভিনয় করলাম ভালো থাকার।
অদ্ভুত মেয়েদের ভগবান মেয়েদের ক্ষমতা  দেন একজন মেয়ে আরেকটা মেয়েকে কাজ না জানার অজুহাতে বাক্যবাণে জর্জরিত করত আর সেই মেয়েটা নিরবে আঁখি ভিজেয়ে কাজ শেখার চেষ্টা করে যেত । মনের ক্ষোভে বাপের বাড়িতে বলতে গেলে যেতামই না ।মা ,বাবা বলত যেতে কখনও দাদা নিতে আসত কিন্তু আমি এড়িয়ে যেতাম কোন অজুহাত দেখিয়ে ।আমার স্বামীর ভালবাসা আমি বুঝতাম না  ,সে বলত নন্দা একটু মানিয়ে নাও মা ওরকম বলেন তোমাকে শেখাবার জন্য । আমি মনে মনে ভাবি ওনার মেয়ে যখন আসে আমার থেকে বয়সে দুগুণ তাঁকে নিয়ে তো আদিখ্যেতার শেষ থাকে না ।যত দোষ আমার মেয়ে হয়ে জন্মানোর জন্য । স্বামী থাকলে শ্বাশুড়ীমা তবুও কথা শোনান কম কিন্তু অন্যত্র বদলি হয়ে গেছেন আমি একা। 
 দুবছরের মাথায় সন্তান সম্ভবা।  প্রথম সন্তান হওয়ার আগের দিন অবধি আমার বিশ্রামের প্রয়োজন কেউ ভাবেনি। যাক প্রথম সন্তান আমার ছেলে হতে শ্বাশুড়ীমাকে খুশি দেখেছিলাম । কিন্তু একমাস পর থেকে হেঁসেলে ডুকতে হয়েছিল । মাত্র কুড়ি বছর বয়সে একটা বাচ্চা নিয়ে, বাচ্চার দেখাশোনা করা তারপর চারবেলা সবার খাবারের ব্যবস্থা করা জানি না কি করে পেরেছি । মা চিঠি লিখেছিলেন আমার শাশুড়িমাকে আমাকে কিছু দিনের জন্য পাঠিয়ে দিতে কিন্তু  আমি চলে গেলে হেঁসেল ঠেলবে কে শ্বাশুড়ীমা হয়তো সেই কারণেই সেকথা উচ্চারণ করেন নি ।  ছেলের যখন ছমাস বয়েস তখন  আমার বর আবার বাড়ির কাছেই  ফিরে আসে বদলি নিয়ে । মাঝে মাঝে ছেলে যখন রাতে ঘুমাতে দিত না তখন ওনি ছেলেকে সামলাতেন আর আমাকে ঘুমাতে বলতেন ।সারাদিনের খাটনির পর আমার আর ক্ষমতা থাকত না আমি ঘুমিয়ে পড়তাম সত্যি সত্যি । 

ছেলের যখন দুবছর বয়েস তখন আমার মেয়ে হলো ,দুটো বাচ্চা নিয়ে আমার হিমসিম অবস্থা তবুও ছেলে,মেয়েদের বড় করলাম অক্লান্ত পরিশ্রম করে ।  আমার চল্লিশের ঘরে বয়েস আমার মেয়ে ১৮ বছরের, ছেলে ২০ বছরের বয়েস । আমার মেয়েকে আমি আমার সব না পাওয়ার আক্ষেপ মেটাতে সেইরকম করে মানুষ করেছি। মেয়ে আমার লেখাপড়ায় ভালো, চোখে স্বপ্ন আছে বড় হবার ।
একদিন বিকেলে ছেলে ,মেয়ে কলেজ থেকে এসেছে আমি ওদের খেতে দিয়ে গল্পের বই পড়া আমার নেশা ছিল তাতে সমস্ত মনোযোগ দিয়ে আছি। সেইসময় ওদের বাবা বাড়িতে ছিল বলল এককাপ চা হবে ।আমি  মেয়েকে বলি যাতো মা বাবাকে এক কাপ চা করে দিয়ে আয় সঙ্গে সঙ্গে মেয়ের ঠাম্মা শুনে বলে কেন মেয়েটা একটু বিশ্রাম নিচ্ছে তোমার সহ্য হচ্ছে না । আমার স্বামীকে দেখলাম প্রথম  মাকে বলতে মা! নন্দা তো যখন আমাদের বাড়িতে প্রথম  আসে তখন তোমার নাতনির মতই বয়েস ছিল তখন তুমি তো তাকে তুমি রেয়াই দাওনি । আমি তখন দিনের পর দেখেছি বাড়িতে আত্মীয় স্বজনের ভীড় তাঁর মধ্যে তুমি ওকে আদেশ দিয়ে সবার সঙ্গে গল্পে মশগুল থাকতে।কখনও সহানুভূতির সঙ্গে ভাবোনি বাচ্চা মেয়েটা সামলাবে কিকরে। শাশুড়িমা প্রচন্ড রেগে বললেন বউ দেখছি তোকে একদম ভেরুয়া করে দিয়েছে।  মেয়ে ঠাম্মাকে বলল না ঠাম্মা মা বাবাকে কিছু বানাইনি বাবার মনুষ্যেত্ব বোধ থেকে বাবা একথা বলেছে ।ছোট থেকে তো মাকে আমি সারাদিন সবার জন্য খাটতে দেখেছি  আজ প্রথম মা আমাকে বলেছ কারণ মায়েরও ইচ্ছা হয় নিজের মতো সময় কাটাতে। ঠাম্মা মেয়েকে বলল এজন্য তোর বাবাকে বলেছিলাম কলেজে ভর্তি করতে হবে  না মেয়েকে  বিয়ের ব্যবস্থা করতে । এতক্ষণ আমি চুপ করে শুনছিলাম আজ প্রথম আমার মেয়ে সত্তা বিদ্রোহ করে উঠল আমি শ্বাশুড়ীমাকে বললাম মা আমার মেয়ে যতদূর পড়তে চাই ততদূর পড়বে, তারপর ও নিজে স্বাবলম্বী হলে তবে বিয়ের কথা ভাববো তার আগে আপনারা কেউ  চেষ্টা করবেন না ওর বিয়ে দেবার ।আমি  আমার মেয়েকে আমার মতো একটা জীবন কিছুতেই দেবো না ।

দুদিন পর দেখি আমার স্বামীর দিদি হাজির  কথায় কথায় আমাকে শোনাল এই বাড়িটা মায়ের বাড়ি তাই মায়ের যা ইচ্ছা হবে সেইমতো সব কাজ হবে ।
আমি বললাম দিদি মাকে অমান্য করে তো এ বাড়িতে কোন কাজ হয়না তবে আমার মেয়ের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত আমি নেবো এ অধিকার কাউকে দেবো না  আমি । আমার ননদ বলল তোমার মেয়ে এই বংশের মেয়ে তুমি কে তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবার। আমার ছেলে বলল পিসিমণি ভুলে যাচ্ছো মায়ের থেকে বড় কেউ হয়না ।এখন যুগ পাল্টেছে বোন এখন লেখাপড়া শিখবে ওর বিয়ের প্রশ্নই ওঠে না । মেয়ের বাবা বলল এই বাড়িতে আমার মেয়ে থাকলে যদি মায়ের অসুবিধা হয় তাহলে আমরা বাড়ি ছেড়ে চলে যাবো সেক্ষেত্রে দিদি তোকে দায়িত্ব নিতে হবে মায়ের । দিদি বলল ভাই তুই এতবড় কথা বলতে পারলি। আমার স্বামী বলল তুই তো একটু আগেই নন্দাকে বললি আমি শুনলাম নন্দাকে বলা মানে আমাকে বলছিস তুই । দিন পাল্টেছে  বাবা,মায়েরা নিজের মেয়েকে স্বাবলম্বী না করে আজকের দিনে মেয়ের  বিয়ের কথা কেউ  ভাবে না। 

আজকে আমার মেয়ে কলকাতায় হাইকোর্টের বিচারকের দায়িত্ব পালন করছে । সেদিন একটা মেয়ের অধিকার নিয়ে লড়াইয়ে আমার মেয়ের খবর চারদিকে । খবরের কাগজে আজ মেয়ের ছবি দিয়ে অনেক কিছু লেখা । মেয়ের ছবিটা যখন ওর  ঠাকুমাকে মেয়ের বাবা দেখাল ।আমার শ্বাশুড়ীমা সেইদিন প্রথম আমাকে ডেকে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন বৌমা তুমিই ঠিক ছিলে আমার ভাবনা ভুল ছিল ।






 

Comments

Popular posts from this blog

আমি মেঘ হতে চাই

তুমি যখন ভাবনায়

ফিরে দেখা (১ ম পর্ব)